বিসিআইয়ের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

সরকারি ঋণ বাড়লে সংকুচিত হতে পারে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, বাজেটের আকার বড় হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হতে পারে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করবে।

গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব অভিমত উঠে আসে। প্রস্তাবিত বাজেটের শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা এবং সংশোধনী প্রস্তাব প্রণয়নের লক্ষ্যে এ আয়োজন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)।

আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপ থাকলেও বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়াবে।’

তিনি জ্বালানি সংকট নিরসনে সুস্পষ্ট উদ্যোগের অভাব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ফলে বাজারে চাহিদা ও উৎপাদন উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি চাপের মুখে পড়তে পারে।’

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন মূল্যস্ফীতি। একই সঙ্গে বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।’

তবে ব্যবসায়ীরা বাজেটের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ট্রান্সকম গ্রুপের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান বলেন, ‘ব্যবসা সহজীকরণে এবারের বাজেটে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ রয়েছে। ওষুধ শিল্পের জন্য বন্ড সুবিধা এবং রফতানিকারকদের জন্য বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ ব্যবসার ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।’

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘বাজেটে বিভিন্ন খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও রাজস্ব আহরণের উৎসভিত্তিক রূপরেখা স্পষ্ট নয়। বিষয়টি আরো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল।’

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যয়, রাজস্ব ও ঘাটতির বাজেট এটি। তবে কর প্রশাসনে সংস্কার ছাড়া অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের চাপ বিদ্যমান করদাতাদের ওপর পড়বে, যা বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।’

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল সম্পর্কে বাজেটে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়ানো ছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হবে।’

ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ কার্যত আদায়ের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আর্থিক খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ টেরিটাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম শাহাদাত হোসেন রফতানিকারকদের ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম জানান, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বীজ আমদানির ক্ষেত্রে পেস্টিসাইড ও ইনসেক্টিসাইডের মতো কর-সুবিধা প্রদানের দাবি জানান।

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারীরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, কর প্রশাসনের সংস্কার, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তাদের মতে, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি না হলে বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

আরও